“এটি একটি ব্যতিক্রম রোগ। মেডিকেল লিটারেচারের এ ধরণের রোগ সম্পর্কিত কোন ঘটনা এ পর্যন্ত লিপিবদ্ধ হয়নি”। হাসপাতালের আই. সি. ইউতে শুয়ে থাকা জাফরের সমস্যা সম্পর্কে এভাবেই ব্যাখ্যা করছিলেন কর্তব্যরত ডাক্তার।

 

জাফর বুয়েটে ইলেকট্রিকাল ইন্জিনিয়ারিং পড়ছে। প্রায় সপ্তাহখানিক আগেও সে একজন পূর্ণ সুস্থ মানুষ ছিল। তার অন্যসব বন্ধুদের মত সেও নিয়মিত ক্লাস; ক্লাসের বিরতিতে আড্ডা, খেলাধুলা করে যাচ্ছিল।

সম্প্রতি তারা কয়েকজন বন্ধু মিলে নতুন একটি প্রজেক্টের জন্য উদ্যোগ নিয়েছে। তাদের টার্গেট হল একটি রোবট তৈরী করা যা বাসার বিভিন্ন কাজে সহযোগিতা করবে। এ প্রজেক্ট নিয়ে জাফর টিম লিডার হিসেবে একটু বেশীই ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল। বেশী রাত জেগে গবেষণা রত থাকা ওর অভ্যাসে পরিণত হচ্ছিল। তবে গত এক মাসে এজন্য স্বাস্থ্য একটু ভেঙ্গে পড়লেও ওর এত বড় অসুখ হবে তা বোঝা যায় নি।

 

“আমাদের মস্তিষ্কের কাজ হল আমাদের বিভিন্ন অঙ্গের কর্মকান্ড নিয়ন্ত্রণ করা। বিভিন্ন অঙ্গের নিয়ন্ত্রণের জন্য মস্তিষ্ককে বিভিন্ন অংশে ভাগ করা আছে। যেমন মোটর কর্টেক্স এর কাজ হল আমাদের চলাফেরা, নড়াচড়ার জন্য প্রয়োজনীয় উদ্দীপণা তৈরী করে তা বিভিন্ন স্থানের মাংসপেশীতে সুনিয়ন্ত্রিত ভাবে প্রেরণ করা। তেমনি কতগুলো অটোনোমাস সেন্টার আছে যেগুলোর কাজ হল আমাদের শরীরের গুরুত্বপূর্ণ কিছু ফাংশন স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিয়ন্ত্রণ করা, যে ফাংশনগুলো সম্পর্কে আমরা সচরাচর সচেতন নই। যেমন, খাদ্য হজম প্রক্রিয়া, শ্বাসপ্রশ্বাস, হৃদপিন্ডের স্পন্দন, রক্তনালীর চাপ নিয়ন্ত্রণ করা ইত্যাদি।  শ্বাসপ্রশ্বাসের ব্যাপারটি ইন্টারেস্টিং। আমাদের অগোচরে আমাদের ফুসফুস অবিরাম নির্দিষ্ট বিরতিতে প্রশ্বাস নিচ্ছে ও নি:শ্বাস ফেলছে। যদিও আমরা চাইলে আমাদের শ্বাসকে একটি নিদিষ্ট মাত্রা পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ করতে পারি । তবে কোন ব্যাক্তি অজ্ঞান হয়ে পড়লে এ নিয়ন্ত্রনটি পূর্ণ ভাবে সংলিষ্ট অটোনোমাস সেন্টারের কাছে চলে যায়। যতক্ষণ পর্যন্ত উক্ত সেন্টারটি বিকল হয়ে না পড়ে ততক্ষন তা আমাদের দেহে প্রয়োজনী অক্সিজেন সরবরাহ করে। বিকল হয়ে পড়লে তখন আর্টিফিসিয়াল ভেন্টিলেশন দিতে হয়।  তবে জাফরের ক্ষেত্রে হয়েছে উক্ত ঘটনাটির ব্যতিক্রম। সে তার শ্বাস প্রশ্বাসের অটোনোমাস কন্ট্রোল হারিয়ে ফেলেছে। কন্ট্রোল তার নিজের সচেতন নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছে। এ কারণেই জাফর যেদিন তার কন্ট্রোল হারিয়ে ফেলেছে সেদিন আপনারা দেখেছেন সে বিছানায় বড় বড় চোখ করে শুয়ে আছে। আর কিছুক্ষণ পরপর বড় বড় শ্বাস ফেলছে। আসলে এ সময় তার সকল চিন্তাভাবনা তার শ্বাস প্রশ্বাসের দিকে চলে গেছে। একমূহুর্ত শ্বাস বন্ধ হলে তার মূর্ছা যাওয়ার কথা। হতে পারে সে এর ঠিক আগ মূহুর্তে অজ্ঞান হয়েওছিল। এবং এরপর যখন জ্ঞান ফিরেছে। সে সাথে সাথে সচেতন হয়ে পড়েছে তার শ্বাস প্রশ্বাস সম্পর্কে”।

“তাহলে এখন, ওকে আই.সি.ইউ সাপোর্ট দিতে হচ্ছে কেন?”

“এ অবস্থায় জাফরকে আই সি ইউ সাপোর্ট দিয়ে কৃত্রিমভাবে শ্বাস প্রশ্বাস চালু রাখার কারণ ওকে চিন্তাভাবনার আড়ষ্টতা তথা এককেন্দ্রিকতা থেকে মুক্তি দেয়া, কেননা আমাদের মন এ বিষয়ে হ্যাবিচুয়েটেড নয়। আরেকটি বিষয় হল ওকে যে কোন মূহুর্তে শ্বাসের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলার রিস্ক ও ভয় থেকে অব্যাহতি দেয়া ”।

“এর কি কোন সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই?”

“যেহেতু ব্যাপারটি সম্পূর্ণ নুতন সুতরাং এটা নিয়ে আমরা বিদেশী ডাক্তারদের একটি টিমের সাথে যোগাযোগ করেছি। এ বিষয়ে আমাদের একটি বোর্ড বসেছিল। বোর্ডের আলোচনার সিদ্ধান্ত হল: এটার কোন মেডিকেশন বর্তমানে নেই। এখন শুধু বাহির থেকে সাপো্র্ট দেয়া আর স্রষ্টার উপর ভরসা করা ছাড়া আমাদের হাতে আর কোন উপায় নেই। যদি তার অটোনোমাস কন্ট্রোল যেভাবে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কোন কারণ ছাড়াই চলে গেছে একই ভাবে যদি স্বয়ংক্রিয় ভাবে ফিরে আসে তবেই কেবল ও বাঁচতে পারবে”।

 

(হাসপাতালের বেডে জাফর। প্রশ্বাস….. নি:শ্বাস……, প্রশ্বাস….. নি:শ্বাস…., প্রশ্বাস…. নি:শ্বাস……….অবচেতন)

 

চারিদিকে পুরোপুরি অন্ধকার। দূরে একটু আলো দেখা যাচ্ছে। আমি আলোর কাছে এগিয়ে গেলাম। দেখি একটি জানালা দিয়ে অন্ধকার ঘরে আলো এসে পড়েছে। আলোর উৎস কি? জানালা দিয়ে ওপাশে তাকালাম। তরুণ বয়সের একটি ছেলেকে দেখা যাচ্ছে রোবট টাইপের একটি যন্ত্র নিয়ে নাড়াচারা করছে। কি ব্যাপার? ছেলেটি কে? ছেলেটিকে দেখে পলাশের মত মনে হচ্ছে। জানালের পাশে একটি দরজা দেখতে পেলাম। দরজা দিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসলাম। পলাশ আমার দিকে তাকাল। জাফর তুই এসেছিস।  রোবটটি দেখিয়ে বলল, জাফর, দেখ্ তোর দেয়া বুদ্ভিমত আমি রোবটটির পাওয়ার লাইনের একটি কন্ট্রোল রোবটের প্রোগ্রামিং এ যোগ করে দিয়েছি। এখন রোবটটা নিজের প্রয়োজন মাফিক পাওয়ার কম বেশী টানতে পারবে। তবে রোবটটি পুরোপুরি পাওয়ার সাপ্লাই বন্ধ করতে পারবে না। বন্ধ করতে চাইলে এলার্ম চালু হয়ে ইমার্জেন্সি পাওয়ার অন হবে। আমি রোবটটিকে কাছে টেনে নিলাম। মনে মনে রোবটটির একটি নাম দিলাম, শুভ। শুভ, তুই জানিস না তুই আমার কত প্রিয়। কত যত্ন দিয়ে আমি তোকে তৈরী করেছি। আমি তোর পাওয়ার সাপ্লাইয়ের তোর একটি স্বাধীন কন্ট্রোল সেট করলাম। তুই পারবি তো তোর নির্ধারিত কাজ করতে।

 

শুভর সাথে যখন আমি মনে মনে কথা বলছিলাম হঠাৎ পিছনের দিক থেকে একটি বিকট শব্দ শুনতে পেলাম। পিছনে তাকিয়ে দেখি একটি বিরাট মাঠ, একদল লোক দৌড়ে মাঠের দিকে ছুটে চলেছে। সবাই সাদা কাফনের কাপর পরা। সবাই কেমন যেন উৎকন্ঠা নিয়ে মাঠে গিয়ে একত্রিত হচ্ছে। দূর থেকে একটি বিয়গলের সুর ভেসে আসছে।

 

পিছন থেকে পরিচিত কন্ঠের একটি ডাক শুনতে পেলাম। আরে এটা মায়ের কন্ঠ না। মা ডাকছে, জাফর, জাফর। হঠাৎ আসেপাশের সবকিছু যেন শুন্যে তলিয়ে যেতে শুরু করেছে, কালো হয়ে আসছে। মা, মা, আমাকে ধর আমি তলিয়ে যাচ্ছি।

 

জাফর চোখ খুলেছে। পাশে তার মা উৎকন্ঠা নিয়ে দাড়িয়ে আছে। জাফর তার শ্বাস প্রশ্বাসের অটোনোমিক কন্ট্রোল ফিরে পেয়েছে। তার বাইরের সাপোর্টিং রেসপিরেশন অফ করে দেয়া হয়েছে। ঘটনাটি ঘটেছে এভাবে: জাফর অবচেতন হয়ে পড়েছিল। এরই মাঝে হঠাৎ করে ভেন্টিলেশন মেশিন কি একটা ত্রুটি দেখা দেয়। কেউ পানিতে ডুবে যাওয়ার সময় যখন শ্বাস বন্ধ হয়ে আসতে থাকে তখন একটু বাতাস পেলে যেভাবে একজন টান দিয়ে শ্বাস নেয় মেশিন বন্ধ হয়ে গেলে পরে জাফর ঠিক সেভাবে একটি লম্বা টান দিয়ে শ্বাস নিতে শুরু করে। ডাক্তারকে ডাকলে তিনি দেখেন যে জাফরের অটোনমিক কন্ট্রোল ফিরে এসেছে। তিনি অক্সিজেন রেখে বাকি সব খুলে দেন। এর কিছুক্ষন পরেই জাফর তার চেতনা ফিরে পেল।

 

এখন গভীর রাত। সবকিছু নিরব। জাফর দু রাকাত তাহাজ্জুদ নামায আদায় করে দুহাত তুলে তার স্রষ্টার কাছে প্রার্থনা করছে:

“হে আল্লাহ, তুমি ক্ষমাশীল। তুমি ক্ষমা করতে পছন্দ কর। তুমি আমাকে ক্ষমা কর। হে আমার স্রষ্টা তুমিই আমাকে কতই না সুন্দর করে সৃষ্টি করেছ। আমি যখন প্রতিটি মূহুর্তে তোমার অবাধ্য হয়েছি। ঠিক মত নামাজ পড়িনি, রোযা রাখিনি। প্রতি পদে পদে তোমার আদেশ অমান্য করেছি। বন্ধুদের সাথে আড্ডায়, কাজে কর্মে তোমার স্মরণ ছিল না। বুঝে কোরআন পড়িনি। তোমার হুকুমগুলো জানার চেষ্টা করিনি। সেই প্রতিটি মূহুর্তে তুমি তোমার প্রিয় সৃষ্টিকে একটি মূহুর্তের জন্যও ভুলোনি। তুমি আমার অজান্তে আমার শ্বাস প্রশ্বাসের ব্যবস্থা করেছ। আমার ক্ষুদার অন্ন দিয়েছ। আমার হৃদপিন্ডের নিয়ন্ত্রণ তুমি তোমার হাতে রেখে আমাকে সচল রেখেছ। হে আমার রব, তুমি আমার অন্ধত্বকে দূর করে দিয়েছ। আমি আমার ভুল বুঝতে পেরেছি। তোমার দেয়া প্রতিটি প্রশ্বাসের মূল্য আমি বুঝতে পেরেছি। আমাকে ক্ষমা করে দাও হে গাফুরুর রাহীম”।

 

প্রতিরাতের মত আজকের রাতও ফজরের দিকে এগিয়ে চলেছে- অঝোর ধারায় কাদছে জাফর।

 

সমাপ্ত

Advertisements