‘God of the gaps’ ফ্যালাসী হল বিজ্ঞানের অমিমাংসিত প্রশ্নগুলোতে স্রষ্টার দোহাই দিয়ে চুপ থাকা।

আপেলটা কেন মাটিতে পড়ল এই প্রশ্নটি নিয়ে চিন্তা করতে আপনি যদি এই বলে থেমে যান যে, আল্লাহর হুকুমে পড়েছে, তাহলে কিন্তু এই প্রশ্নটির উত্তর আর এগুবে না। এ কারণেই বিজ্ঞানের জগতে ‘Methodological naturalism’ অনুসরণ করা হয়। অর্থাৎ, যে কোন প্রাকৃতিক ঘটনার ব্যাখ্যা প্রাকৃতিক নিয়ম দিয়ে করতে হবে এ ধরনের একটি অঘোষিত নিয়ম বিজ্ঞানের জগতে মেনে চলা হয়।

তবে তার মানে এই না যে, বিজ্ঞান একটা ঘটনাকে প্রাকৃতিক নিয়ম দিয়ে ব্যাখ্যা করতে পারলে সে স্রষ্টার অস্তিত্বকে অস্বীকার করলো।

কারণ, বিজ্ঞানের শুরু হয় প্রশ্ন থেকে এবং প্রথম দিককার অধিকাংশ বিজ্ঞানীই তাদের অনুসন্ধানের পিছনে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে বলেছেন বা স্বীকার করেছেন যে স্রষ্টা কোন নিয়মে পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন সে বিষয়টিই অনুসন্ধান করার উদ্দেশ্যেই তাদের গবেষণা।

বিষয়টি একটি উদাহরণ দিয়ে বুঝাই। ধরুন পৃথিবীতে কিভাবে এত প্রজাতি আসল সেটা নিয়ে আপনি চিন্তা করছেন। এখন আপনি যদি বলেন যে আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন তা-ই এসেছে তাহলে কিন্তু ঠিক ব্যাখ্যাটা এসে থেমে যাবে। প্রশ্নটি যদি আপনি একটু প্যারাফ্রেজ করে এভাবে চিন্তা করেন যে, কোন নিয়মে আল্লাহ বিভিন্ন প্রজাতি তৈরী করে থাকতে পারেন? তখন উত্তরে যদি আপনাকে উপযুক্ত প্রমাণ সহকারে দেখানো হয় প্রথম কোষগুলোর মধ্যেই ভ্যারিয়েশন সৃষ্টি ও প্রাকৃতিক নির্বাচন প্রক্রিয়ায় উক্ত ভ্যারিয়েশনের সিলেকশনের মাধ্যমে বিবর্তিত হয়ে বিভিন্ন প্রজাতি তৈরী হওয়ার পদ্ধতি দেয়া ছিলো, তাহলে বরং স্রষ্টা সৃষ্টিকুশলতা দেখে আপনার বিশ্বাস আরও দৃঢ় হবে।

ইন ফ্যাক্ট এই প্রেক্ষিতে আপনি যদি নিওডারউইনিজম প্রদত্ত পদ্ধতিতে আনস্যাটিসফাইড থাকেন তখন আপনি ‘বিশ্বাসী’ হয়েও বিকল্প হিসেবে অন্য কোন প্রাকৃতিক ব্যাখ্যা দাড় করাতে চেষ্টা করবেন। অর্থাৎ, তখন আপনি যদি নব্য-ডারউইনবাদের সমালোচনা করেন আপনার লক্ষ্য থাকবে নব্য-ডারউইনবাদের ‘পদ্ধতির’ সমালোচনা করে ‘বিকল্প’ প্রাকৃতিক পদ্ধতি উপস্থাপন করার চেষ্টা করা। সেক্ষেত্রে স্রষ্টার অস্তিত্ব ভুল প্রমানিত হয়ে যাবে না।

তাহলে, বিশ্বাসীদের মধ্যে বিজ্ঞানের ভিতর স্রষ্টাকে খুজার এই প্রবণতা আসলো কোথা থেকে? এর একটা অংশ এসেছে মিলিট্যান্ট নাস্তিক ও বিজ্ঞানবাদীতার অনুসারী কতৃক বিজ্ঞানকে নাস্তিকতার পক্ষে প্রমাণ হিসেবে প্রচারণার প্রতিক্রিয়াস্বরূপ।

যেমন: ডকিন্স বলছেন:

“Although atheism might have been logically tenable before Darwin, Darwin made it possible to be an intellectually fulfilled atheist” (১)

অর্থাৎ, ডকিন্স বিজ্ঞানকে পরোক্ষভাবে নাস্তিকতার পক্ষে প্রমাণ হিসেবে প্রচার করছেন। অথচ, উপরে আমরা দেখেছি যে বিবর্তনবাদ প্রমানিত হলেও স্রষ্টা অপ্রমানিত হয়ে যায় না।

বিখ্যাত নাস্তিক জীবাশ্মবিদ স্টিফেন জে গোল্ড ধর্ম ও বিজ্ঞানকে বলছেন ‘Non Overlapping Magisteria (NOMA)’ (২). অর্থাৎ বিজ্ঞান ও ধর্মের গবেষণা, পড়াশোনা ও প্রয়োগের ক্ষেত্র আলাদা।

কিন্তু, ডকিন্স, হ্যারিস, ডেনেট, হিচেন্সরা এমন একদল তরুন তৈরী করেছে যারা বিজ্ঞানবাদীতার অনুসারী। এদের মতে ধর্মের নিয়মনীতির জায়গাটুকুও (যেমন: মোরালিটি, অ্যারিস্টটালিয়ান ফাইনাল কজ সম্পর্কে প্রশ্ন ) বিজ্ঞান নির্ধারণ করে দিবে। যার মাধ্যমে সূক্ষ্ন ভাবে বিজ্ঞানীদের প্রতি এক ধরনের ঘৃণা বিশ্বাসীদের মন মগজে ঢুকিয়ে দেয়া হচ্ছে।

এছাড়াও, অন্যান্য অনেক নাস্তিক বিজ্ঞানীও তাদের বৈজ্ঞানিক গবেষণা তথা Methodological naturalism-এর সাথে তাদের বিশ্বাস তথা Philosophical naturalism-কে জুড়ে দিচ্ছে।

অধিকাংশ বিশ্বাসীর ফিলোসফিকাল ডিসকোর্সের এই জটিল নিয়মাবলী (অর্থাৎ অ্যারিস্টটালিয়ান কজোলজীর ম্যাটেরিয়াল, ফর্মাল, ইফিসিয়েন্ট ও ফাইনাল কজ) সম্পর্কে মাথা ঘামানো সময় নেই বিধায় তাদেরকে ডকিন্স এণ্ড গং রা সহজেই ধোকায় ফেলতে পারছে।

আস্তিকদের জানা দরকার যে, উক্ত ফাইনাল কজ অর্থাৎ ‘সবকিছুর সর্বশেষ কারণ কে?’ এই প্রশ্নের উত্তর আমাদেরকে দুটো বিভাগ দেয়: দর্শন ও ধর্ম।

তবে দর্শন আপনাকে ফাইনাল কজ হিসেবে স্রষ্টার অস্তিত্বের নেসেসিটি, তার বৈশিষ্ট্য, ক্ষমতা, গুন সম্পর্কে ধারণা দিবে এবং ধর্ম আপনার উক্ত ধারণাকে তথা স্রষ্টার অস্তিত্বকে কনফার্ম করবে এবং স্রষ্টা আপনাকে কি উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করেছেন এবং কি করলে তার সন্তুষ্টি অর্জন করা যাবে সে সম্পর্কে বিস্তারিত নিয়মাবলী জানাবে।

সুতরাং বিশ্বাসীদের একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ হল বিজ্ঞানবাদীতা (Scientism)-এর আবরণ থেকে বিজ্ঞানকে উন্মুক্ত করে উপস্থাপন করা এবং দেখানো যে বিজ্ঞান আসলে নাস্তিক দর্শনের এনডর্সমেন্ট দেয় না।

তবে একটা প্রশ্ন থেকে যায়, আল্লাহ কোরআনে যে বার বার বলেছেন সৃষ্টিতে তার নিদর্শন আছে। তাহলে সৃষ্টি নিয়ে চিন্তা করলে কি আমরা তার নিদর্শন পাবো না? আমার মনে হয়, বিজ্ঞানের মধ্য দিয়ে স্রষ্টাকে খুজার প্রবণতা তৈরী হওয়ার এটিও একটি কারণ।

এবং, আমি মনে করি স্রষ্টার সৃষ্টি নিয়ে চিন্তা করলে তার নিদর্শন পাওয়া যায়। যেমন: মহাবিশ্বের ফাইন টিউনিং, বায়োলজিকাল বিইং-এর ডিজাইন ইনফারেন্স ও হিউম্যান ইনটেলেক্ট-এর ইউনিক ফিচারস থেকে স্রষ্টার অস্তিত্বের পক্ষে অ্যাবডাকটিভ বা ইনডাক্টিভ ইনফারেন্স আনা যায়।

অর্থাৎ সায়েন্টিফিক ইনভেস্টিগেশন চূড়ান্ত পর্যায়ে দর্শনের দিকে স্বত:স্ফূর্তভাবেই নিয়ে যায়।


রেফারেন্স:
১. Dawkins, Richard. 1986. The Blind Watchmaker. New York: Norton, p 6.
২. Stephen Jay Gould, “Non overlapping Magisteria”. Accessed 15 March 2018; Retrieved from: http://www.blc.arizona.edu/…/Gould%20Nonoverlapping%20Magis…